শতাংশ, কাঠা, বিঘা, একর: বাংলাদেশে জমির মাপের একক ও রূপান্তর
এক শতাংশ ৪৩৫.৬ বর্গফুট, এক কাঠা ৭২০ বর্গফুট — কিন্তু "এক বিঘা" জেলা বদলালেই বদলে যায়। জমি কেনাবেচায় সবচেয়ে বেশি বিরোধ হয় এই এককের গরমিল থেকেই।
বাংলাদেশে জমির হিসাব একসঙ্গে দুই ব্যবস্থায় চলে। সরকারি রেকর্ডে — খতিয়ান, দাখিলা, দলিল — জমির পরিমাণ লেখা হয় একর ও শতাংশে। আর বাজারে কেনাবেচার সময় মানুষ বলে কাঠা, বিঘা কিংবা ছটাকে। দুটি ব্যবস্থার মধ্যে রূপান্তর না জানলে একই জমিকে দুই পক্ষ দুই রকম বুঝতে পারে, আর সেখান থেকেই বিরোধের শুরু।
ভিত্তি এককগুলো
সব হিসাবের ভিত্তি বর্গফুট। নিচের মানগুলো মুখস্থ রাখলে বাকি সব রূপান্তর নিজেই করা যায়।
| একক | বর্গফুট | শতাংশে | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| ১ ছটাক | ৪৫ | ০.১০৩ | কাঠার ১৬ ভাগের এক ভাগ |
| ১ কাঠা | ৭২০ | ১.৬৫৩ | ঢাকা ও বেশির ভাগ শহরের প্রচলিত মান |
| ১ শতাংশ (ডেসিমেল) | ৪৩৫.৬ | ১ | সরকারি রেকর্ডের একক |
| ১ বিঘা | ১৪,৪০০ | ৩৩.০৬ | ২০ কাঠা — তবে অঞ্চলভেদে ভিন্ন |
| ১ একর | ৪৩,৫৬০ | ১০০ | খতিয়ানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত |
| ১ হেক্টর | ১,০৭,৬৩৯ | ২৪৭.১ | পরিসংখ্যান ও কৃষি হিসাবে |
যে রূপান্তরগুলো প্রতিদিন লাগে
- ১ একর = ১০০ শতাংশ = ৩ বিঘা ৫ কাঠা (প্রায়) = ৪৩,৫৬০ বর্গফুট
- ১ বিঘা = ২০ কাঠা = ৩৩ শতাংশ (প্রায়) = ১৪,৪০০ বর্গফুট
- ১ কাঠা = ১৬ ছটাক = ১.৬৫ শতাংশ = ৭২০ বর্গফুট
- ১ শতাংশ = ০.৬০৫ কাঠা = ৪৩৫.৬ বর্গফুট = প্রায় ৪০.৪৭ বর্গমিটার
- ১০ শতাংশ = ৬.০৫ কাঠা = ৪,৩৫৬ বর্গফুট
- ১ কাঠা জমিতে ২০ ফুট × ৩৬ ফুট মাপের একটি প্লট ধরে
বিঘা কেন এক জায়গায় এক রকম নয়
বিঘা কোনো আইনসিদ্ধ মানসম্মত একক নয় — এটি প্রথাগত। ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে ১ বিঘা = ২০ কাঠা = ৩৩ শতাংশ ধরা হয়। কিন্তু দেশের কিছু অঞ্চলে, বিশেষত উত্তরবঙ্গ ও কিছু সীমান্তবর্তী এলাকায়, প্রচলিত বিঘার মান ভিন্ন — কোথাও ৫০ শতাংশ, কোথাও তারও কম-বেশি। কাঠার মানও সব জায়গায় ৭২০ বর্গফুট নয়; কোথাও ১ কাঠা ৭৩৩ বা তার কাছাকাছি ধরা হয়।
খতিয়ানে লেখা সংখ্যা কীভাবে পড়বেন
খতিয়ানে জমির পরিমাণ সাধারণত দশমিকসহ একরে লেখা থাকে, যেমন ০.১৩৫০ একর। এটিকে শতাংশে বদলাতে ১০০ দিয়ে গুণ করুন: ০.১৩৫০ × ১০০ = ১৩.৫০ শতাংশ। এরপর কাঠায় নিতে চাইলে ১.৬৫৩ দিয়ে ভাগ করুন: ১৩.৫০ ÷ ১.৬৫৩ ≈ ৮.১৭ কাঠা।
একাধিক দাগে ছড়ানো জমির ক্ষেত্রে প্রতিটি দাগের পরিমাণ আলাদা থাকে এবং খতিয়ানের মোট পরিমাণ সেগুলোর যোগফল। একজন সহ-মালিকের প্রাপ্য বের করতে খতিয়ানে লেখা "অংশ" (যেমন ১/৪, ০.১২৫) দিয়ে গুণ করতে হয়।
উদাহরণ
ধরা যাক একটি খতিয়ানে মোট জমি ০.৪৮০০ একর এবং আপনার অংশ ১/৩। তাহলে মোট = ৪৮ শতাংশ, আপনার প্রাপ্য = ৪৮ ÷ ৩ = ১৬ শতাংশ = ১৬ × ৪৩৫.৬ = ৬,৯৬৯.৬ বর্গফুট ≈ ৯.৬৮ কাঠা।
মাঠে মেপে পাওয়া আয়তন রেকর্ডের সঙ্গে না মিললে
বাস্তবে মেপে পাওয়া আয়তন আর খতিয়ানে লেখা পরিমাণে পার্থক্য থাকা খুবই সাধারণ ঘটনা। কারণগুলো সাধারণত এরকম:
- পুরোনো জরিপের মাপ শিকল ও কম্পাসে করা — আধুনিক জিপিএস মাপের সঙ্গে কিছুটা পার্থক্য স্বাভাবিক।
- দখলের সীমানা আর রেকর্ডের সীমানা এক নয় — সময়ের সঙ্গে আইল সরে যায়।
- রাস্তা, খাল বা সরকারি অধিগ্রহণে জমির অংশ কেটে গেছে কিন্তু রেকর্ড হালনাগাদ হয়নি।
- ঢালু জমির ক্ষেত্রে মানচিত্রে দেখানো আয়তন অনুভূমিক প্রক্ষেপণ, ভূপৃষ্ঠের প্রকৃত ঢালু আয়তন নয়।
- সহ-মালিকদের মধ্যে অলিখিত বণ্টন হয়েছে যা রেকর্ডে ওঠেনি।
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য পাওয়া গেলে সমাধান হলো লাইসেন্সপ্রাপ্ত আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে মৌজা ম্যাপ ধরে সরেজমিন মাপ করানো। মানচিত্রে আঁকা মাপ প্রাথমিক ধারণা ও দরকষাকষির জন্য চমৎকার, কিন্তু সীমানা বিরোধে আইনগত প্রমাণ হিসেবে সরেজমিন জরিপই লাগে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
এক শতাংশ কত বর্গফুট?
১ শতাংশ = ৪৩৫.৬ বর্গফুট। এটি এক একরের (৪৩,৫৬০ বর্গফুট) একশ ভাগের এক ভাগ।
এক কাঠা কত শতাংশ?
৭২০ বর্গফুট ধরে ১ কাঠা = ৭২০ ÷ ৪৩৫.৬ = ১.৬৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৬০.৫ শতাংশে ৩৬.৬ কাঠা।
এক একরে কত বিঘা?
ঢাকার প্রচলিত মানে ১ একর = ১০০ ÷ ৩৩.০৬ = ৩.০২৫ বিঘা, অর্থাৎ প্রায় ৩ বিঘা ০.৫ কাঠা।
দলিলে বিঘায় লেখা থাকলে সমস্যা কী?
বিঘার মান অঞ্চলভেদে ভিন্ন হওয়ায় পরে ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধ হতে পারে। শতাংশ বা বর্গফুটে লেখা থাকলে সেই অস্পষ্টতা থাকে না এবং খতিয়ানের সঙ্গে সরাসরি মেলানো যায়।
হেক্টর কোথায় ব্যবহৃত হয়?
কৃষি পরিসংখ্যান, প্রকল্প নথি ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে। ১ হেক্টর = ২.৪৭১ একর = ২৪৭.১ শতাংশ।
স্যাটেলাইট ছবিতে সীমানা এঁকে আয়তন সঙ্গে সঙ্গে শতাংশ, কাঠা, বিঘা ও বর্গফুটে দেখে নিন।
মানচিত্রে জমি মাপুন