উত্তরাধিকারে জমির অংশ: কে কতটুকু পাবেন
উত্তরাধিকারের হিসাব ভুল হলে পুরো পরিবার বছরের পর বছর মামলায় জড়ায়। মূল নিয়মগুলো ও একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বণ্টনের ধারণা পরিষ্কার করা হলো।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকার আইন ধর্মভেদে ভিন্ন। মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ) এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের জন্য নিজ নিজ ব্যক্তিগত আইন প্রযোজ্য। নিচের অংশে মূলত মুসলিম উত্তরাধিকারের সাধারণ নিয়মগুলো আলোচনা করা হয়েছে, শেষে হিন্দু আইনের প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে।
বণ্টনের আগে যা বাদ যায়
মৃতের রেখে যাওয়া সম্পত্তি সরাসরি ভাগ হয় না। ইসলামি বিধান অনুযায়ী প্রথমে নিচের বিষয়গুলো নিষ্পন্ন হয়, তারপর অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হয়:
- দাফন-কাফনের ন্যায্য ব্যয়।
- মৃতের ঋণ পরিশোধ।
- বৈধ ওসিয়ত (উইল) — যা মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারে না এবং সাধারণত ওয়ারিশ নন এমন ব্যক্তির অনুকূলে হয়।
প্রধান ওয়ারিশদের নির্ধারিত অংশ
| ওয়ারিশ | সন্তান থাকলে | সন্তান না থাকলে |
|---|---|---|
| স্ত্রী (একাধিক হলে যৌথভাবে) | ১/৮ | ১/৪ |
| স্বামী | ১/৪ | ১/২ |
| মা | ১/৬ | ১/৩ (শর্তসাপেক্ষ) |
| বাবা | ১/৬ (অবশিষ্টাংশও পেতে পারেন) | অবশিষ্টাংশ |
| কন্যা (পুত্র না থাকলে, একজন) | ১/২ | — |
| কন্যা (পুত্র না থাকলে, দুই বা তার বেশি) | যৌথভাবে ২/৩ | — |
পুত্র থাকলে কন্যার নির্ধারিত অংশ প্রযোজ্য হয় না; তখন নির্ধারিত অংশধারীদের প্রাপ্য দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে এই অনুপাতে ভাগ হয়: এক পুত্র = দুই কন্যার সমান।
একটি উদাহরণ
ধরা যাক একজন ব্যক্তি ১২০ শতাংশ জমি রেখে মারা গেলেন। ঋণ ও ওসিয়ত নেই। জীবিত আছেন: স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যা।
- স্ত্রীর অংশ ১/৮ = ১২০ ÷ ৮ = ১৫ শতাংশ।
- অবশিষ্ট = ১২০ − ১৫ = ১০৫ শতাংশ, যা সন্তানদের মধ্যে ভাগ হবে।
- অনুপাত: পুত্র ২ ভাগ করে দুজনে ৪ ভাগ, কন্যা ১ ভাগ — মোট ৫ ভাগ।
- এক ভাগ = ১০৫ ÷ ৫ = ২১ শতাংশ।
- প্রত্যেক পুত্র = ৪২ শতাংশ, কন্যা = ২১ শতাংশ, স্ত্রী = ১৫ শতাংশ। যোগফল ১২০ শতাংশ।
মৃতের বাবা বা মা জীবিত থাকলে হিসাব বদলে যায় — তাঁদের নির্ধারিত ১/৬ অংশ আগে বাদ দিয়ে তারপর অবশিষ্ট সন্তানদের মধ্যে ভাগ হবে। এ কারণেই প্রতিটি পরিবারের হিসাব আলাদা করে করতে হয়।
কাগজে-কলমে যেভাবে কার্যকর করবেন
- মৃত্যু সনদ সংগ্রহ
সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মৃত্যু নিবন্ধন সনদ নিন।
- ওয়ারিশ সনদ
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ নিন, যেখানে সব ওয়ারিশের নাম ও সম্পর্ক উল্লেখ থাকবে।
- সম্পত্তির তালিকা তৈরি
মৃতের নামে থাকা সব খতিয়ান ও দাগ চিহ্নিত করুন — অনলাইনে খতিয়ান অনুসন্ধান এখানে কাজে লাগে।
- বণ্টননামা বা আপসনামা
ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে নির্দিষ্ট দাগ ভাগ করে নিতে চাইলে রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা দলিল করুন। না হলে সবাই নির্দিষ্ট অংশের যৌথ মালিক থাকবেন।
- নামজারি
ওয়ারিশ সনদ ও বণ্টননামার ভিত্তিতে উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারির আবেদন করুন, যাতে রেকর্ডে নাম হালনাগাদ হয়।
- দাখিলা হালনাগাদ
নতুন খতিয়ান অনুযায়ী নিজ নামে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করুন।
হিন্দু আইন সম্পর্কে সংক্ষেপে
বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার মূলত দায়ভাগ মতবাদ অনুসারে পরিচালিত হয় এবং এর নিয়ম মুসলিম আইন থেকে ভিন্ন। উত্তরাধিকারীদের ক্রম, বিধবার অধিকার ও কন্যার অধিকার সংক্রান্ত বিধান আলাদা এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনি ব্যাখ্যা জটিল। হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান পরিবারের সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বিশেষভাবে জরুরি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
কন্যা কি জমি পান?
হ্যাঁ। মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কন্যা নির্ধারিত অংশ পান। পুত্র থাকলে পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পান, কিন্তু কন্যাকে বঞ্চিত করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
ওসিয়ত করে কি সব সম্পত্তি একজনকে দেওয়া যায়?
না। বৈধ ওসিয়ত সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত এবং সাধারণত ওয়ারিশ নন এমন ব্যক্তির অনুকূলে হয়। এর বেশি বা ওয়ারিশের অনুকূলে ওসিয়ত করতে হলে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে।
জীবদ্দশায় জমি দিয়ে গেলে কি সেটি উত্তরাধিকারে গণ্য হবে?
জীবদ্দশায় বৈধভাবে সম্পন্ন ও রেজিস্ট্রিকৃত হেবা বা বিক্রয় সাধারণত উত্তরাধিকারের বাইরে, কারণ মৃত্যুর সময় সেটি আর মৃতের সম্পত্তি নয়। তবে দলিলের বৈধতা নিয়ে বিরোধ হলে বিষয়টি আদালতে যেতে পারে।
সব ওয়ারিশ একমত না হলে কী হবে?
তখন বণ্টনের জন্য দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা করতে হয়। আদালত অংশ নির্ধারণ করে জমি ভাগের ডিক্রি দেন।
বিদেশে থাকলে নামজারি করা যাবে?
হ্যাঁ, বৈধ পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে প্রতিনিধি নিয়োগ করে প্রক্রিয়া চালানো যায়।
উত্তরাধিকার নিয়ে আরও শতাধিক প্রশ্ন ও উত্তর আমাদের জ্ঞানভান্ডারে সাজানো আছে।
উত্তরাধিকার প্রশ্নোত্তর দেখুন